জাগো বাংলাদেশ: যা ঘটেছিল বালিকা এভ্রিলের বিয়ের দিন

0 68

বিয়ে জীবনের একটি উৎসবের নাম। যে উৎসবের মধ্য দিয়ে জীবনে নতুন মোড় আসে। কিন্তু এই উৎসব হয়ে যায় বলিদান, যখন সেটা হয় বাল্যবিয়ে। বিনোদন অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ জান্নাতুল নাঈম এভ্রিল। কৈশোরে তার বিয়ে না হলে তিনি উঠতে পারতেন মিস ওয়ার্ল্ড মঞ্চে। তার স্বপ্নভাঙার সেই ঘটনা প্রায় সবাই জানেন। তবে তার বাল্যবিয়ে নিয়ে এবারই প্রথম বিস্তারিত মুখ খুললেন এভ্রিল।

সম্প্রতি প্রচার হওয়া চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের ‘জাগো বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে মোশাররফ করিমের মুখোমুখি বসে জীবনের গল্প শোনাতে গিয়ে এভ্রিল শুরুতে জানান, ছোটবেলা থেকে ডানপিটে ছিলেন তিনি। বাবার সঙ্গে শৈশব থেকে তার বন্ধনটা ছিল অন্যরকম। তার কথায়, ‘আমরা চার ভাইবোন। আমার মনে হতো, ওই সময় বাবা আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, আমাকেই প্রাধান্য দিতেন। কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার একমাস পর একদিন শুনলাম, আমাকে দেখতে আসবে। হাতে আংটি পরিয়ে দেবে। আমি তো শুনে রেগে কান্নাকাটি শুরু করে দিলাম।’

সেই সময় এভ্রিলের বয়স ১৬ বছর। মোশাররফের সামনে বসে পরের ঘটনাও শোনালেন তিনি, ‘‘কেঁদে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে ধরে আনা হলো। সবাই জানালো, এখন আমাকে আংটি পরাতে আসবে। তখন বাবার কাছে জানতে চাইলাম, কেন আমাকে বিয়ে দিতে চাইছো? তার উত্তর ছিল, ‘দেখো, তুমি মেয়ে হয়ে জন্মেছো, আমার তো একটা দায়িত্ব আছে। আমার মেয়েকে আমি বিয়ে দেবো, আমার দায়িত্বটা শেষ করবো’। তখন প্রশ্ন করলাম, আমাকে বিয়ে দিলেই তোমার দায়িত্ব শেষ? তিনি জোর গলায় বললেন, ‘হ্যাঁ, শেষ।’ তখন বাবার পা ধরে খুব কেঁদে বলেছিলাম, বিয়ে করবো না।

পড়ালেখা করবো। কিন্তু তিনি কিছুতেই শুনছিলেন না। মনে হচ্ছিল, বাবা পাষাণ হয়ে গিয়েছিলেন!’’

এর কারণও জানালেন এভ্রিল। তিনি দেখেছেন, গ্রামে মধ্যবিত্ত পরিবারে সুন্দরী বা লম্বা মেয়ে থাকলে চারপাশের মানুষ কানাকানি করে। তার কথায়, ‘মানুষ বাবাকে যে চাপ দিচ্ছিল তা নিতে পারছিলেন না তিনি। যদি আমাকে কেউ তুলে নিয়ে যায়, এই ভয় ধরে বসেছিল তাকে। মানসম্মান নিয়ে খুব ভয় পান তিনি। তখন বাবাকে একটা কথা বলেছিলাম, তুমি তোমার দায়িত্ব শেষ করো ঠিক আছে, কিন্তু আজ থেকে তুমি আমার বাবা না। ছোটবেলা থেকে তোমার সঙ্গে আমার এত ভালোবাসার সম্পর্ক, অথচ আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছো না, আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করার কথা তুমি একবারও ভাবছো না, শুধু সমাজের কথা চিন্তা করে একটা ছোট মেয়েকে তুমি বিয়ে দিয়ে দিচ্ছো। তোমার মেয়ের নিরাপত্তা দিতে পারছো না বলে বিয়ে দিচ্ছো, সেক্ষেত্রে তুমি আমার বাবা হতেই পারো না। তার সঙ্গে আমার শেষ কথা ছিল এটুকুই।’

বিয়ের আসরে কী ঘটেছিল, মোশাররফের সঙ্গে তাও শেয়ার করেছেন এভ্রিল। তিনি বলেন, ‘বিয়েতে মাকে বলেছিলাম, মা আমি সুইসাইড করবো। আমি মরে যাবো। মা আমাকে কানে কানে বলেছিলেন, ‘তুই শুধু বেঁচে থাকবি আমার জন্য। যদি তুই কালকে মরে যাস, তাহলে কিন্তু কবরে একটা লাশ যাবে না, যাবে দুইটা লাশ! কারণ, আমি তোকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।’
কথায় কথায় অতীত নিয়ে অনেক কথা বললেও সেসব নিয়ে ভাবতে চান না তিনি। নিজেকে সামলে এই সুন্দরী বললেন, ‘আমি শুধু ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে চাই। সারা জীবন আর শেষ নিঃশ্বাস অবধি স্বপ্ন দেখতে চাই। স্বপ্ন দেখা বন্ধ করা যাবে না। মানুষ তখনই ফুরিয়ে যায়, শেষ হয়ে যায়, যখন সে স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায়। ওইসব সমাজকে দেখিয়ে দিতে চাই, যারা একটা মেয়ের বয়স নিয়ে ভাবে না, তার বিয়ে হলে কী ঘটতে পারে তা চিন্তা করে না, যারা শুধু দারিদ্র্য, নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন দিক চিন্তা করে মেয়েটাকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠালেই যেন বোঝা শেষ।’

এভ্রিলের জীবনের গল্প শোনা শেষে মোশাররফ করিম বলেন, ‘এভ্রিলের বাবা তার মেয়েকে ভালোবাসতেন। সেখানে সমস্যা ছিল না। কিন্তু এভ্রিলকে বিয়ে না দিলে কী কী ঘটতে পারে, সেসব ভয় যে তাকে দেখানো হলো, সেই ভয় থেকে তিনি সরতে পারলেন না। তাই সেই ভয়ের উৎসটাকে তাড়ানো সবচেয়ে জরুরি। যেখান থেকে আমি স্বাধীনভাবে বলতে পারবো- আমি এই হতে চাই, আমাকে হতে দাও। ভয় দেখিও না। কারণ, আমি, এভ্রিলসহ যারা এ দেশের মানুষ, এ দেশের সন্তান, তারা প্রত্যেকেই এ দেশের সম্পদ। তাদের হয়ে উঠতে দিতে হবে। তাই ভয়কে তাড়াতে হবে।’

মোশাররফ চেয়েছিলেন, বাল্যবিয়ের কারণে এভ্রিলের মতো মেয়েদের বেদনা ছুঁয়ে যাক দর্শকের মনকে। যেন দর্শকও ব্যথিত হন আর সবার টনক নড়ে।

এরপর বৃষ্টি নামে আরেকটি মেয়ের গল্প শোনানো হলো ‘জাগো বাংলাদেশ’ নামের এ অনুষ্ঠানে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার এক বছর পরেই তাকে একদিন হুট করে বিয়ে দেওয়া হয়। তখন তার ১৩ বছর। এই মেয়েটির স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করে স্কুল শিক্ষিকা হওয়ার। কিন্তু বাল্যবিয়ে তার স্বপ্নকে মেরে ফেলেছে।

‘জাগো বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানের পরিচালক আরিফ এ আহনাফ পরিসংখ্যানে দেখিয়েছেন, বাল্যবিয়েতে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দেন বাবা-মা (৫৩.১০ শতাংশ)। আত্মীয়স্বজনের কারণে ১০.৬২ শতাংশ, ১৩.২৭ শতাংশ নিজের আগ্রহে আর অন্যান্য কারণে বাল্যবিবাহ হচ্ছে ১.৭৭ শতাংশ।

আশার কথা হলো, শিক্ষাগত পেশা বা গুরুত্বপূর্ণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিষয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপটে বাল্যবিয়ে ৩১ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশে ৯ হাজার মেয়ের ওপর পরিচালিত এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। মেয়েদের দক্ষ পেশাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে, এই হার ২৩ শতাংশ কমে যাবে।

এসব তথ্য জানিয়ে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক অভিনেতা মোশাররফ করিম বললেন, ‘শিক্ষা খুব জরুরি, পেশাগত জায়গায় এসে যদি একটি শক্তি অর্জন করে, সে বেকার না, সে একটা কিছু করতে পারে। এটি তার একটি শক্তি। নিজের জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, বিয়ে করবো নাকি করবো না। তখন বিভিন্ন ধরনের চাপ তাকে অতটা পরাভূত করতে পারে না।’

মোশাররফের মন্তব্য, ‘বাল্যবিয়ের কারণে আমরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও অমানবিকতা বুঝতে পারছি। তাই সচেতনতা প্রয়োজন, মানুষকে বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে বাল্যবিয়ে দিয়ে ভুল করছেন, আপনার সন্তানের ক্ষেত্রে, আপনার সন্তানের পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেত্রে। তাই বাল্যবিবাহ আইনের প্রয়োগ যেন ঠিকঠাক হয় সেদিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানাই।’

চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের ‘জাগো বাংলাদেশ’ নামের এই অনুষ্ঠানে আরেক পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, দেশের প্রায় ৬৬.৩৭ শতাংশ মানুষ বাল্যবিবাহের আইন সম্পর্কে জানে না। আর ২৫.৫৫ শতাংশ আইনটি সম্পর্কে জানে।

অনুষ্ঠানে আইনজীবী রওনক জাহান লতা জানান, ১৯২৯ সাল থেকে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন আছে আমাদের। ২০১৭ সালে নতুন আইন এসেছে। এতে বিয়ের জন্য ১৮ বছর বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই অপরাধটিকে আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও আপসযোগ্য বলা হয়েছে। তবে তিনি বললেন, ‘নতুন আইনে ১৯ ধারায় একটা শর্ত আছে, বাবা-মা বা অভিভাবক মনে করেন, ওই কিশোরী বা শিশুকে সর্বোত্তম স্বার্থে আদালতের অনুমতি নিয়ে বিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু ১৮ বছরের নিচে কত বছর বয়স থেকে, তা আইনে বলা নেই।’

যদিও আইনকে বন্ধু মনে করেন মোশাররফ। তিনি বললেন, ‘ধরুন কেউ আমাকে হুমকি দিলো, কিন্তু আমি কী করবো? আমার তেমন শারীরিক শক্তি নেই। তাহলে কোথায় যাবো? সেই কোথায় যাওয়াটা আমরা অধিকাংশ সময় খুঁজে পাই না। জানি আইন-আদালত আছে। কিন্তু মামলা করার সাহস পাই না। কারণ, আমরা দীর্ঘকাল ধরে এভাবেই অভ্যস্ত। সেই জায়গা থেকে বের হওয়া খুব জরুরি। আমার জন্য আইন আছে, আইনের প্রয়োগ আছে, সুতরাং আমি সাহসী। একটা জায়গায় গিয়ে বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে আছি। সেখান থেকে আমরা বের হয়ে আসবো।’

যোগ করে মোশাররফ বলেন, ‘আমি কি ভাবতে পারি আমার সন্তানের ক্ষেত্রে? মানুষের একক আমি বলতে চাই মন। সেই মনের জায়গাটায় কিন্তু মানুষ ভীষণ স্বাধীন। আমি জানি না, প্রকৃতি তাকে কী হওয়ার শক্তি দিয়ে রেখেছে। অথচ আমি অদ্ভুতভাবে সেই মনের ভেতর জোরপূর্বক প্রবেশ করছি। ঢুকে আমি মনকে ঘুরিয়ে দিতে চাই, পরিবর্তিত করতে চাই।

আমি তার স্বপ্ন ও ইচ্ছেকে মেরে ফেলি। সেই অধিকার আমাদের নেই। সুন্দর জীবন ও সুন্দর স্বাধীনতা সবারই দরকার।’

‘জাগো বাংলাদেশ’-এর এবারের পর্বের শুরুতেই দেখানো হয় আঁখি, নীলা, লিপি, সালমা, মানসুরা, মাহমুদার মতো বাল্যবিয়ের শিকার হওয়া বেশ কিছু মেয়ের মুখ। সবার বয়স ষোলোর নিচে। কিন্তু প্রত্যেকের একটি করে সন্তান আছে। কারওবা দুই-তিনটি। এরপর মোশাররফ করিম বলেন, ‌‘যে সময়টা নিজের স্বপ্নের মধ্যে বিচরণ করার কথা, যে সময়টা তার হয়ে ওঠার কথা, সেই সময়ে আমরা কতটা নির্মম হলে সন্তান জন্মদানের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছি।’

উত্তরবঙ্গে বাল্যবিয়ে সবচেয়ে বেশি হয় বলে অনুষ্ঠানে মন্তব্য একজন অ্যাক্টিভিস্ট। এক্ষেত্রে মানসিকতাকে ভাঙা যাচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি। ১২-১৩ বছর হলেই বাবা-মা মনে করেন, মেয়েকে বিয়ে দেওয়া দরকার। তার বক্তব্য, ‘আমরা একটা প্রজন্মকে হারিয়ে ফেলছি, ওদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছি, ওরা যে বাচ্চা জন্ম দিচ্ছি, তারা অসুস্থ হচ্ছে। বাল্যবিয়ে না ঠেকালে কীভাবে আমরা এগোবো?’

মোশাররফ করিম বললেন, ‘অনেক কিছু জানলাম, বুঝলাম। বুঝতে পারলাম ঠিকই, কিন্তু নিজের অনুভূতির মধ্যে ঢুকলো কিনা। কতটা করুণ, কতটা খারাপ লাগার। এভ্রিল ও বৃষ্টির মতো হাজার হাজার মেয়ে আছে, যারা হয়তো এর চেয়েও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’.

(বাঁ থেকে) আরিফ এ আহনাফ, মোশাররফ করিম ও জান্নাতুল নাঈম এভ্রিল (ছবি: সংগৃহীত)

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.