দৃশ্যগুলো মুছে গেছে

0 275

দুপুরের গনগনে তেজোদীপ্ত সূর্যটা কিছুটা দূর্বল হয়ে পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। রিকশাটা সুমনা’র পারিবারিক কবরস্থানের সামনে এসে থামলো। লোকটা অত্যন্ত বিনয়ী গলায় বললো,’ এইতো আপনার বাড়ী এসে গেছে। নামেন। ‘ বুকের ভেতর গোরস্থানের নিঃস্তব্ধতা বইছে। কয়েক হাত দূরেই পাশাপাশি বাবা,মা শুয়ে আছেন। সুমনা বোবা দৃষ্টিতে অসহায়ের মত সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। স্পষ্ট যেন শুনতে পাচ্ছে বাবা, মা তাকে নাম ধরে কাছে ডাকছে। শরীর, মন বোধশূন্য হয়ে পড়েছে। সে রিকশাতেই বসে আছে৷ নামতে পারছেনা। বাবা, মায়ের সিথানের পাশে বকুল ফুল গাছ। গাছের সবুজ পাতারা বাতাসের মর্মর ধ্বনির সাথে মিলেমিশে অপূর্ব সুরে বাঁশি বাজাচ্ছে। সুমনা ঝুপ করে রিকশা থেকে নেমে পড়লো। রিকশাওয়ালা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। লোকটাকে অনেক্ষণ দেরি করে দিয়েছে। তার জন্য ভেতরে একটা অপরাধ বোধ অনুভব করছে। সুমনা একা দাঁড়িয়ে আছে। নৈঃশব্দ ঘিরে ফেলেছে তাকে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এক বুক শ্বাস নিল সে। স্মৃতিরা আষ্টেপৃষ্ঠে ঝাপ্টে ধরেছে। স্মৃতি ভারে নুয়ে পড়া সুমনা তার ছোটবেলার পুকুর পাড়, কাদামাটির রাস্তা, টিনের চৌচালা ঘর, বাঁশঝাড়, ধানক্ষেত, ফুলের বাগান, খড়ের স্তুপ, সুপারি বাগান, গোয়াল ঘর খুঁজতে থাকে। কিন্তু কিছুই খুঁজে পেল না ৷ কিছু নেই কোথায়ও। সুমনার চেনা দৃশ্যগুলো সব মুছে গেছে। হঠাৎ মনে হল, এখানেই কি আসার কথা ছিল! ভুল করে ভুল জায়গায় আসি নিতো! নিজের মনকে নিজেই প্রবোধ দেয়। স্মৃতি শুধু কাঁদায়। স্মৃতির মায়াময় চারদিকের উৎসগুলো অনর্গল কাঁদিয়ে যাচ্ছে সুমনাকে। কান্নার হাউমাউ শব্দ বাতাসের তীব্র শো শো শব্দের সাথে শূন্যে মিলিয়ে যায়। চোখের পানি মুছে দেওয়ার কেউ নেই। নিজেই নিজের চোখের পানি মুছে নেয়। সুমনার স্বর্গীয় ঠিকানা এই বাড়ীর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে কত মায়া, গল্প, হাসি-আনন্দ, রঙিন স্বপ্ন। অনেক দিন আগেই সেগুলো মুছে গেছে।

শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি বিজড়িত বাড়ীটিতে সুমনা প্রায় এক যুগ পরে ভাইবোনের সাথে ঈদুল আযহার আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য এসেছে। নারিকেল আর সুপারি গাছের ছায়া বেষ্টিত মায়াময় শীতল মাটির বাড়ীটাকে দখল করে নিয়েছে আকাশ ছোঁয়া ইট, কাঠের অট্রালিকা। এই বাড়ীর শোবার ঘরগুলো থেকে এখন আর আকাশ দেখা যায়না৷ মাঝরাতে জানালা দিয়ে জোনাকি পোকা ভুল করে মোশারির ভেতরে ঢুকে পড়েনা। টিনের চালে বৃষ্টিজলের নৃত্য শোনা যায় না মাঝরাতে কিংবা নির্জন দুপুরে। দক্ষিণের বাতাস অনায়াসেই ঢুকতে পারেনা ঘরের প্রতিটি কোণে। সর্বত্র দেয়াল। মাটির নিকোনো উঠোনটা ইটের সারির দখলে। কাদা-মাটির জন্য সুমনার তৃষ্ণার্ত প্রাণ বিন্দু পরিমাণ কাদা, জল খুঁজে পেল না কোথায়ও। বাড়ীর পূর্ব পাশে ছিল বাঁশ ঝাড়। এখানে বসেই লুকিয়ে দেখতাম মাছরাঙার মাছ শিকারের কলাকৌশল। বাঁশ ঝাড় কেটে ফেলা হয়েছে। যেদিকে তাকাই শুধু শূন্যতা।

বাড়ীর সবচেয়ে বেশী শোভা বর্ধনকারী কৃষ্ণচূড়া ফুল গাছটিকেও দেখা যাচ্ছে না। লাল লাল ফুলে বর্ষাকালে কি যে সুন্দর লাগতো গাছটিকে। কর্ম ক্লান্ত দিনশেষে শ্রান্ত শরীরে গাছটার ছায়ায় বসে কত অলস সময় কাটাতাম। আব্বা খুব যত্ন করতেন গাছটার। বাড়তি ডালপালা কেটে দিতেন। গাছের অতিরিক্ত লতা, পাতায় ঘরের টিনে মরিচা ধরে নস্ট হয়ে যেত। বর্ষাকালে শ্যাওলা জমতো বলে আম্মা গাছটাকে কেটে ফেলতে চাইতেন। আব্বা কোনভাবেই গাছটাকে কাটতে দেন নাই। অথচ বাবার বাড়ীতে গাছটার আজ কোন চিহ্ন নেই। মনে হচ্ছে কোনকালেই আব্বার প্রিয় কৃষ্ণচূড়া ফুল গাছটা এখানে ছিল না। কয়েক বছরের ব্যবধানে সম্পূর্ণরুপে দৃশ্যপটগুলো মুছে গেছে।

বাড়ীর ভেতরে প্রবেশ করে ঘরে না গিয়ে বাহিরে দাঁড়িয়ে স্মৃতি রোমন্থনে কাতর হয়ে পড়েছে সুমনা। হরেক রঙের ফুল, ফল, পশু, পাখী, পাতাবাহারদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠেছিল এই বাড়ীটিতেই। হাতে কোদাল, শাবল নিয়ে আব্বার সাথে বাড়ীর উত্তর দিকের খোলা মাঠে পেয়ারা, কলা বাগানে কত মাটি নিরাতাম। সাঁজের বেলায় গাছে পানি দিতাম। গাছের স্বাস্থ্য রক্ষায় শেকড়ে সার দিতাম। ফুলের বাগানে আসা রঙ -বেরঙের প্রজাপতিদের পিছন পিছন সারা বাড়ী দৌড়ে বেড়াতাম। এ ফুল থেকে ও ফুলে ঘুরে ঘুরে মৌমাছির মধু খাওয়ার অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য দেখে মুগ্ধতায় হারাতাম। লজ্জাবতীদের ছুঁয়ে দেওয়া মাত্র তাদের চুপসে যাওয়া দেখে হাসিতে ভেঙে পড়তাম। কালের আবর্তে মুছে যাওয়া অন্যসব দৃশ্যগুলোর সাথে ফুল, ফলের বাগানগুলোও হারিয়ে গেছে।

মামাতো, খালাতো ভাইবোনসহ গ্রামের অন্য সমবয়সীদের সাথে সময় পেলেই বিকেলবেলা বাহিরের মাঠে খেলতে যেতাম। খেলাধুলার দারুণ পরিবেশ ছিল তখন। আগ্রহও ছিল বেশ।

গ্রামের পাড়া, প্রতিবেশীরা একে অন্যের সাথে মিলেমিশে জড়িয়ে থাকতো। বিকেল ঘনিয়ে অন্ধকার নেমে এলেও দেখা যেত গ্রামের রাস্তায় ছোটছোট ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে গল্প, আড্ডা, আনন্দে মেতে থাকতো। মায়ার চাদর ঢেকে রাখতো পুরো গ্রামটিকে। কোন বখাটে, উচ্ছৃঙখলের পাল্লায় পড়তো না গ্রামের কেউ। বিশুদ্ধ পরিবেশ ছিল গ্রাম জুড়ে। লুকোচুরি (পলান, পলান) খেলতে গিয়ে অন্যের ঘরের কত কাপ, প্লেট যে ভেংগেছি তার হিসেব নেই। তবুও তারা খুব একটা রেগে যেতেন না। আম্মা ঘটনা জেনে বকা দিলে গাছের মগডালে উঠে ডাল, পাতার ভেতরে লুকিয়ে থাকতাম। খুঁজতে খুঁজতে না পেয়ে বাড়ীতে হৈ চৈ পড়লে পরে গাছ থেকে নেমে আসতাম। ততক্ষণে আম্মার রাগ কমে যেত, আমিও শাস্তি থেকে বেঁচে যেতাম। গাছে উঠার অভ্যেস বন্ধ করানোর জন্য আম্মা কত ভয় দেখাতেন। বলতেন তেতুল গাছে ভূত থাকে। তেতুল খাওয়ার লোভ সামলাতে না পেরে সন্ধ্যার পরেও কত তেতুল গাছে কত উঠেছি। কোনদিন ভূতের সাথে দেখা হয় নি। আদৌ কি তেতুল গাছে ভূত থাকে? জানি না। জীবনে কত কিছুই তো অজানা রয়ে গেছে।

হাত থেকে গরু ছুটে গিয়ে অন্যের জমিনের ধান খেয়ে সাবাড় করে ফেলেছে তাও খোয়াড়ে দেয় নি কেউ। এক বাড়ীর হাস, মুরগী, ছাগল আরেক বাড়ীতে চলে যেত। খবর পেলেই ফিরিয়ে দিত। আহা! কি নির্মল ছিল তখনকার গ্রামের সহজ, সরল পরিবেশ! সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে শৈশব, কৈশরের চেনা দৃশ্যগুলো সব মুছে গেলেও ভুলতে পারিনি কিছুই।

স্মৃতির অথৈ সাগরে ভাসতে ভাসতে সুমনা উঠোনে একটা চেয়ার টেনে বসলো৷ চারদিকে এত জৌলুষ তবুও বাড়ীটিকে জরা জীর্ণ মনে হলো। কোন উচ্ছ্বাস, কোলাহল নেই। চারপাশজুড়ে সব নিরব, নিথর। বাড়ীর মূল প্রাণ বাবা, মা নেই বলেই হয়তো এমন লাগছে। আবারো নিজেকে নিজেই স্বান্তনা দিল।

বাড়ীর পশ্চিম দিকে চোখ যেতেই সুমনা থমকে গেলো। গোয়াল ঘরটা আগের জায়গাতেই আছে। তবে আগের মত স্যাঁতস্যাঁতে নয়, বেশ গুছানো ও পরিপাটি। নাইলনের দড়ি দিয়ে কুরবানীর জন্য কেনা গুরুটাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার সামনে বেতের ঝুড়িতে রাখা সবুজ ঘাস। সন্ধ্যার ম্লান আলোতে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি ঘাসের দিকে গরুটার কোন মনযোগ নেই, সে আমার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। সদ্য কুরবানীর জন্য কেনা গরুটার অবাক চাহনির দিকে তাকিয়ে নস্টালজিক হয়ে পড়ি।

আমাদের একটা গাই ছিল। আম্মা রাতদিন পোয়াতি গাইটার সেবা যত্ন করতেন। কাচি আর বাঁশের ঝাপি হাতে মাঠের পর মাঠ চষে সবুজ কচকচে ঘাস কেটে আনতাম গাইটাকে খাওয়ানোর জন্য। পরম আদরে তাকে ঘাসগুলো খাওয়াতাম। ঘরুর ঘাস খাওয়ার দৃশ্য এত সুন্দর যে আমি সম্মোহিতের মত তাকিয়ে দেখতাম।

পরিবারের সবার সেবা, যত্নে গাইটি একদিন শেষরাতে ফুটফুটে একটা বাছুরের জন্ম দিল। সারারাত আমরা কেউ ঘুমাই নি। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আম্মা গরু ও তার বাছুরটিকে শুকনো জায়গায় ছালার বস্তা দিয়ে শুইয়ে দিয়েছে। গোয়াল ঘর পরিষ্কার করে ফজরের নামায পড়ে আম্মা সহ আমরা সবাই ঘুমাতে গিয়েছিলাম। ঘুম থেকে উঠে পুরো বাড়ী তন্নতন্ন করে খুঁজেও বাছুরটিকে কোথায়ও পেলাম না। গাইটার চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে। বাড়ীর দক্ষিণ পাশে বেড়ীবাঁধের গভীর পানিতে অবশেষে মৃত বাছুরটিকে পাওয়া গেলো। সবাই হতভম্ব। কারো মুখ কোন কথা নেই। বারবার আমি গাইটির চোখের পানি মুছে দিয়েছিলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করেছিলাম। পাথর চোখে গাইটি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।

কয়েক সপ্তাহ পরেই কুরবানীর ঈদ। সন্তান হারানোর শোকেই মনে হয় গরুটি খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়ে দিন দিন কংকাল হয়ে পড়েছিল। মাঠে নিয়ে গেলেও শুয়ে থাকতো। ঘাস, পানি কিছুই খেতে চাইতো না। আম্মার সিদ্ধান্তে কুরবানীর হাঁটে গরুটিকে বিক্রি করে দেওয়া হলো। হাঁটে নিয়ে যাওয়ার আগে সেদিন গরুটি যেভাবে আমার মুখের দিকে বেদনায় ভারাক্রান্ত হৃদয়ে শুকনো চোখে তাকিয়ে ছিল, এত এত বছর পর আজো ঠিক একইভাবে গরুটি আমার মুখের দিকে শুকনো চোখে তাকিয়ে আছে। হায় জীবন! কেন মায়াময় দৃশ্যগুলো মুছে গিয়েও এভাবে কস্ট দিতে স্মৃতি হয়ে বারবার ফিরে আসে।

বড় ভাইএর ডাকে সম্ভিত ফিরে পায় সুমনা। আকাশের শেষ উজ্জ্বল আভাটুকুও হারিয়ে গেছে অনেক আগেই দিগন্তে। রাত পোহালেই কুরবানীর ঈদ। গরুটিকে জবাই করা হবে। আর কোনদিন গরুটার চোখে চোখ রাখা হবে না। বুকের ভেতরে চিনচিন ব্যথা অনুভব করছে সুমনা। সে তার বুকের বা দিকটার ভার যেন আর বহন করতে পারছে না। দু’হাতে শক্ত করে বুক চেপে সুমনা ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলো।

80%
Awesome
  • Design

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.