আমি তখন দুরন্ত কৈশোরে

0 22

সাপ্তাহিক একমাত্র স্কুল ছুটির দিন শুক্রবারে আমার সহপাঠীরা যখন বেলা করে ঘুম থেকে উঠতো তখন আমাকে খুব ভোরে জাগতে হতো। আম্মা বলতেন আহার, নিদ্রা, ভয় যত বাড়ায় ততই হয়। শুক্রবার সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার, বিকেলে হরেক রকম হাতের কারুকার্যময় পিঠা বানানো সবগুলো কাজ আম্মার সাথে করতে হতো বলে সহপাঠীদের সাথে খেলাধুলা, গল্প করা, বাহিরে বেড়াতে যাওয়া, টিভি দেখা কিছুই করতে পারতাম না। গোমরা মুখ দেখে আম্মা বলতেন সব কাজ শিখে রাখা ভাল। জীবনে যখন যে কাজ দরকার পড়বে সে কাজ অনায়াসেই করতে পারবে। আমি সারাজীবন বেঁচে থাকবো না। জীবন বাবা, মায়ের কোল নয়। জীবন অনেক কঠিন। জীবনের এই উঁচুনিচু পথে তোমার দুই পা একমাত্র ভরসা এবং এই পথে তোমাকে একাই হাঁটতে হবে। আজ যতই রাগ কর যেদিন মা থাকবোনা দুনিয়াতে সেদিন বুঝবে যা করছি এখন সবি তোমার ভালোর জন্য করছি।
আম্মার কথাগুলো শুনে সেদিন মনে মনে রাগ আরো দ্বিগুণ বেড়েছে।

অনেকদিন পর আম্মা পোলাও, মাংস রান্না করেছে । পুরো বাড়ীর সীমানা, আকাশ, বাতাস সব আম্মার রান্নার সুঘ্রাণে মৌ মৌ করছে। সবাই মিলে খেতে বসেছি এর মধ্যেই দলবেঁধে মেহমান এসে হাজির। মেহমানদের খাইয়ে আমার ভাগ্যে পোলাও, মাংস কিছুই জোটেনি। গোমরা মুখ দেখে আম্মা স্বান্তনা দিয়ে বললেন, দশজন মিলেমিশে খেলে হয় চিজ, একজনে খেলে হয় বিষ। আম্মার মুখে এমন কথা শুনে সেদিন ও খুব রাগ হয়েছিল মনে মনে।

ফেরিওয়ালার হাঁক শুনেই লিপিস্টক, নেইলপলিশ, ক্রীম কেনার জন্য টাকা চাইলেই আম্মা সোজা বলতেন যাও হাত পায়ের নখ সুন্দর করে কেটে সাবান দিয়ে মুখ ধুয়ে আসো। পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অংগ। কৃত্তিম সাজে সজ্জিত না হয়ে নিজেকে পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন রাখো। সেদিন ও আম্মার উপরে ভীষণ রাগ হয়েছিল মনে মনে।

পাশের বাড়ীর বউ, শ্বাশুড়ী পালাক্রমে এসে আম্মার কাছে দুজনের সুখদুঃখের কথাগুলো বলে যায়। দুজন-ই দুজনের নামে বদনাম করে৷ আম্মা সাধ্যমতো তাঁদের বুজিয়ে, শুনিয়ে ভালো রাখবার চেষ্টা করেন। আমি আম্মার পাশে বসে তাদের সব কথা শুনি। একদিন শ্বাশুড়ীর কথা বউএর কাছে বলে দেয়ায় আম্মা আমাকে খুব বকেছিলেন এবং বলেছিলেন, কথা পেটে রাখলে হয় গুণ আর বলে দিলে হয় খুন।
কথাগুলোর অর্থ না বুজে সেদিন ও মনে মনে আম্মার উপর রাগ করেছিলাম।

পুরো সপ্তাহের রুটিন দেখে আমাকে জীবন যাপন করতে হতো। সকালের কাজ সকালেই করতে হবে, বিকেলে করা যাবেনা। ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে ঘুমাতে হবে, ঘুম থেকে উঠতে হবে। সময়ের কাজ সময়ে শেষ করতে হবে। আম্মা বলতেন, করলে কাজ শরবত না করলে কাজ পাহাড় পর্বত। জীবন একটি দৌড় প্রতিযোগীতা। এখানে সময় নস্ট করলে পিছিয়ে পড়তে হয়।
জীবনের শৈশব, কৈশোরে আম্মার কথাগুলো শুনে রাগ করে পুকুরের পানিতে পা ডুবিয়ে একা একা বসে থাকতাম আর মনে মনে বলতাম, বড় হয়ে আমি আম্মার থেকে অনেক দূরে চলে যাব একদিন যেখানে আম্মার শাষন থাকবেনা।
আমার অবুঝ মনের কথাগুলো যে এভাবে ফলে যাবে বুঝতে পারিনি। আমি দূর্ভাগা। বাবা, মায়ের থেকে দূরে থাকার মত দূর্ভাগ্য আর কিছুই নেই দুনিয়াতে। আম্মাকে ছেড়ে সত্যি হাজার হাজার মাইল দূরে চলে এসেছি। আম্মার একটু শাষন, জীবনের দিকনির্দেশনার জন্য আজ বুকের ভেতর কত রক্ত ঝরে তা শুধু আমি আর সৃষ্টিকর্তা জানেন। আর কেউ জানেন না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আম্মার উপর রাগগুলো আজ আমার জীবনবোধ, জীবনের দর্শনে পরিণত হয়েছে।
জীবনে কিছুই হতে পারিনি আমি। তবুও আজকের এই আমি যতটুকু যেভাবেই বেচে আছি তার সবটুকু অবদান আমার মায়ের।

মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার আগে শেষ মুহূর্তের যন্ত্রণা, আর্তনাদের কথা কাউকেই বলে যাবার সুযোগ হয়না। দেশ ছেড়ে বিদেশে আসার পর ফোনে আম্মার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা হতো। শরীর খারাপ লাগলেই আমাকে বলতেন। আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে আজ থেকে ৪ বছর আগে ঠিক আজকের এই দিনে আম্মার কি অসুখ হয়েছিল… ….. যে অসুখে চিরদিনের জন্য আমাকে/ আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলেন…….।

এপাড়ে-ওপাড়ে সব মায়েরা ভালো থাকুক।

আল্লাহুম্মা রাব্বীর হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগীরা।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.