আমার মুজিবুর আমার বঙ্গবন্ধু

0 64
আগেও পড়েছি বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি এখন আবারো পড়ছি ।তবে এবার সাথে নিয়েছি কারাগারের রোজনামচা । দুই পাতা অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ে মনে হয় রোজনামচায় কি যেন মিল ছিল তাই তিন পাতা আবার ওটা থেকে পড়ছি। আমার বর লক্ষ্য করছে আমি বই দুটি তে অসংখ্য আঁকা উকি করে ফেলছি ।সে বেশ বিরক্তই হয়ে একদিন বলল পড়ছো পড় আঁকা উকি করছো কেন? বললাম আমি আসলে নোট নিচ্ছিলাম।ও সাদা কাগজ হাতে ধরিয়ে দেয়। বুঝলাম এই বই দুটি তার ও প্রিয় ।
আমার সব সময়ই মনে হয়েছে এই মানুষটা তাঁর জীবন যৌবন ব্যয় করেছেন দেশের মানুষের কথা ভাবতে ভাবতে , কখন সময় পেলেন এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদ আমাদের জন্য তৈরী করবার!? নানান রকম সমালোচনা ও গবেষণা বিষয়ক তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে হ্যাঁ তিনিই এটি খাতায় নোট করেছেন যেমন টা মানুষ ডায়েরী আকারে লিখে ।খুব জটিল কিছু সময়ের রাজনৈতিক পরিক্রমা আর রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে এক নিবেদিত প্রাণ তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী তে যাদের সাথে চলে ফিরে তিনি দেশ নেতা হয়েছেন সবার কথা অকপটে তিনি লিখে রেখেছেন।
বংগবন্ধু কে জানতে আমি অন্যদের লেখা যেমন পড়তে পছন্দ করি তার চেয়ে ও বেশি ভালো লাগে উনার নিজের লেখা এই বই দুটির ভেতরে ডুব দিতে ।উনার চোখে দেশ কে জানতে হলে বার বার পডেও যেন কিছু একটা রয়ে যায়।পুরো বইটি রাজনীতিবিদের সে সময়ের কর্ম কান্ড নিয়ে লেখা ।আমরা ধরেই নেই বঙ্গবন্ধু যেহেতু লিখেছেন নিশ্চয়ই বইটিতে রাশভারী তথ্য উপাত্তে ঠাসা ।নানান রকম আদেশ উপদেশ বাণী তে ভরপুর। আর বঙ্গবন্ধুর লেখা মানেই অনেক দেশ , জানাও পোড়াও , দুর্ভিক্ষ, ভুখা আন্দোলন এসব কিছু । এসব ধারনা থেকেই আমার মনের উনার দুটি বই নিয়েই মনানা প্রশ্ন উসখুস করতেই থাকে ।পুরো বইটা অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় লেখা। কেন কোন ভারী ভারী কথাবার্তা নেই !? তিনি কোথাও উপদেশমূলক বাণী দেয়ার চেষ্টা করেন নাই। অত্যন্ত সহজ ভাষায়, বলা যায় একরকম নির্লিপ্ত আবেগ বর্জিত ভাষায় পুরো ঘটনা প্রবাহ লিখে গেছেন। কিছু জায়গায় ঘটনার প্রয়োজনে কিছু আবেগতাড়িত কথাবার্তা এসেছে। কিন্তু সেটার পরিমান খুব বেশি নয়। আর ভাষা অত্যন্ত সাবলীল যে পড়তে কোন অসুবিধা হয় না, বিরক্তও লাগে না। এত সাধারণ একজন মানুষ কেমন করে এত বড় অসাধারণ কাজ করে গেলেন। কেমন করে আমাদের কে মায়ের ভাষায় কথা বলতে এগিয়ে নিয়ে গেলেন !? কেমন করে অতি সাধারন এক পরিবারের সদস্য হয়ে নিজের জীবন যৌবন কে তুচ্ছ করে অকাতরে শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্যে বিলিয়ে দিতে পারলেন? কি দায় পরেছিল তাঁর?
আমার উনাকে নিয়ে জানবার আগ্রহ সারাজীবনে ও শেষ হবে না । পরীক্ষার প্রস্তুতি নেবার মত করে দুটো বই পাশাপাশি নিয়ে পড়ি আপনাদের কে আগেই বলেছি । কানাডা থেকে দেবর ফোন দেয় জানতে চায় কি করছি মুখে কথা বলি না বই তুলে দেখাই । সে ও বলে ভাবি অনেক রিভিউ পড়েছি তবে আসল বই টি পড়া হয় নি । তাঁকে ও না পড়তে পারার আফছোস করতে দেখি ।
২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা চারটি খাতা আকস্মিকভাবে তাঁর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে আসে ।খাতাগুলি অতি পুরানো, পাতাগুলি জীর্ণপ্রায় এবং লেখা প্রায়শ অস্পষ্ট। মূল্যবান সেই খাতাগুলি পড়ে জানা গেল এটি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, যা তিনি ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীণ অবস্থায় লেখা শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ করতে পারেননি।
তাই এটিকে তাঁর প্রত্যক্ষ স্মৃতিচারনমূলক আত্মজীবনীই বলা যায়। অনুলিখনের মাধ্যমে অন্য কারো হাতে লিপিবদ্ধ নয় বরং শেখ মুজিব নিজেই জেলখানায় বসে নিজের স্মৃতি থেকে বইটি লিখেন।
বইটির সময় কাল 1938-1955 সময়কার রাজনীতি নিয়ে ।ঐ সময়কার সরাসরি মাঠ পর্যায়ের রাজনীতির সম্পর্কে বিষধ ভাবে জানতে পারি ।
গ্রামের বাড়ি, জন্মবৃত্তান্ত, বংশ, ও তরুন কালের কিছু ঘটনা পাঠকের সুবিধার্থে তিনি দিয়েছেন। মাঝে মাঝেই বইটা ডায়েরী ও মনে হয় না। মনে হয় আমার সামনে উনাকে দেখতে পাই।
উনার রাজনৈতিক জীবনের শুরু মোটামুটি ১৯৩৮ সালের দিকে ।তখন তাঁর তখন ১৮ বছর বয়স ।
একদিন সোহরাওয়ার্দী তাদের স্কুল পরিদর্শনে আসেন তখন থেকে তার মনে রাজনীতি বাসা বাঁধে। তবে সরাসরি তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন ১৯৪১ সালে তার মেট্রিক পরীক্ষার পর থেকে।  ৪৩ এর দূর্ভিক্ষের সময় পুরোপুরি মাঠ পর্যায়ের কর্মী হিসাবে নিজেকে নিয়োজিত করেন। রাজনীতি করতে গিয়ে পরিবার থেকে কখনোই বাধাপ্রাপ্ত হন নাই। বরং তার বাবা তাকে সবসময় উৎসাহ যোগাতেন এবং স্ত্রীর কাছ থেকেও কখনো পিছুটান পেতে হয় নি। তার বাবা তাকে বলেছিলেন, “বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব নাপাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ  তো সুখের কথাতবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না। আর একটা কথা মনে রেখ,’ sincerity of purpose and honesty of purpose’থাকলে জীবনে পরাজিত হবানা।
বাংলাদেশ নামক কাব্যের অমর কবি বঙ্গবন্ধুও বেঁচে ছিলেন মাত্র পঞ্চান্ন বছর। অথচ এই বয়সেই তিনি হিমালয়ের সমান খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। দেখতেও ছিলেন বিশাল বড়, মানুষও ছিলেন আরো বিশাল। জীবিতকালেই তিনি খ্যাতির তুঙ্গে উঠেছিলেন। আর ঘাতকদের নির্মম বুলেটের আঘাতে মৃত্যুর পর পৃথিবীময় তাঁর কীর্তি হয়ে উঠেছে মহামানবের। বঙ্গবন্ধুই হলেন বাঙালিদের মহামানব যিনি এনে দিয়েছেন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশকে তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সোনার মত করে। কিন্তু নরপশু ঘাতকরা তাঁকে সেটি করতে দেয়নি। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। ঘাতকের দল ছেয়েছিল সমূলে বঙ্গবন্ধু কে বাংলার মাটি থেকে মুছে ফেলতে। পারেনি । পারবেও না । ঘাতকদের ধারণা মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে । জীবিত মুজিবের চেয়ে মৃত মুজিব হাজার হাজার গুণে উজ্জ্বল হয়েছেন। যতদিন বাংলাদেশে নামক রাষ্ট্র পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকবে , যতদিন পদ্মা মেঘনা যমুনার জলে বাতাস বইবে ততদিন , যতদিন পৃথিবীর বুকে একজন বাঙালী বেঁচে থাকবে ততদিন বেঁচে থাকবেন আমাদের মুজিবর আমার বঙ্গবন্ধু।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.